প্রকাশিত:
৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৩
ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল: একবিংশ শতাব্দীর তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক বিশ্বে একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রেষ্ঠত্ব আর কেবল তার আর্থিক মূলধনের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ধারিত হয় প্রতিষ্ঠানের 'মানবসম্পদ' বা 'হিউম্যান ক্যাপিটাল'-এর উৎকর্ষের ওপর।
প্রথাগতভাবে হিউম্যান রিসোর্স (HR) বিভাগকে কেবল ফাইলপত্র ব্যবস্থাপনা বা বেতন-ভাতা সংক্রান্ত একটি 'সাপোর্ট ফাংশন' হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানের পরিবর্তনশীল বাজার এবং প্রযুক্তির দ্রুত উত্থানের ফলে এই ধারণা আমূল বদলে গেছে।
একজন দক্ষ এইচআর ম্যানেজার আজ কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, বরং তিনি প্রতিষ্ঠানের টেকসই সাফল্যের একজন ‘কৌশলগত অংশীদার’ বা ‘পিপল স্ট্র্যাটেজিস্ট’। ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে আইনি সুরক্ষা এবং ইতিবাচক কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কর্পোরেট খাতে শ্রম আইনের প্রয়োগ এবং ডিজিটাল রূপান্তরের এই সন্ধিক্ষণে একজন এইচআর পেশাদারের ভূমিকা কেন এবং কীভাবে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে- সেই প্রেক্ষাপটেই এই বিশেষ বিশ্লেষণ।
কৌশলগত ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব (Strategic Business Partnership):
আধুনিক এইচআর ম্যানেজার শুধু প্রশাসনিক কাজেই সীমাবদ্ধ নন; তিনি ব্যবসায়িক কৌশল প্রণয়নে অংশীদার হিসাবে ভূমিকা রাখে। মানবসম্পদ পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার বিষয়টি দক্ষ এইচআর ম্যানেজার নিশ্চিত করে থাকে। প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারেণে ট্যালেন্ট খুজে বের করা এবং মন্দার সময় খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখে কর্মী ধরে রাখা, এই কাজগুলো এইচআর ম্যানেজার করে থাকে।
ট্যালেন্ট এ্যাকুইজিশন ও রিটেনশন (Total acqisition retention):
সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক পদে বসানো এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দক্ষ কর্মীকে ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষ এইচআর ম্যানেজার এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট পাথ এবং ন্যায্য মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মী অস্থিরতা কমিয়ে আনে।
কর্মী উন্নয়ন ও লার্নিং কালচার (Employee Development & Learning Culture):
কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি (upskilling) এবং পুনঃদক্ষতা (reskilling) বর্তমান সময়ে জরুরি। এইচআর ম্যানেজার প্রশিক্ষণ ও ডেভেলপমেন্ট (L&D) প্ল্যান তৈরির মাধ্যমে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানকে বাজারের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে থাকে।
লিগ্যাল কমপ্লায়েন্স ও গভর্নেন্স (Legal compliance & Governance):
শ্রম আইন, করপোরেট গভর্নেন্স, বৈষম্যমূলক আচরণ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয় মেনে চলা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। দক্ষ এইচআর ম্যানেজার এই আইনি জটিলতাগুলো পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানকে মামলা-মোকদ্দমা এবং সুনামগত ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে থাকে।
কর্মী মনোবল ও কর্পোরেট কালচার (Employee Morale & Corporate Culture):
একটি ইতিবাচক কর্মপরিবেশ তৈরি করা এইচআর ম্যানেজার-এর প্রধান কাজ। কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য (mental well-being), কর্ম-জীবনের ভারসাম্য (work-life balance) এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি (inclusive culture) নিশ্চিত করে কর্মীদের ব্যস্ততা (engagement) ও উৎপাদনশীলতা সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করে থাকে।
একজন দক্ষ এইচআর ম্যানেজার আজকের কর্পোরেট বিশ্বে ‘পিপল স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তাকে শুধু ‘সাপোর্ট ফাংশন’ না ভেবে ‘বিজনেস ড্রাইভার’ হিসেবে দেখা হয়। এই ভূমিকায় পৌঁছাতে হলে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা (এমবিএ/এমএইচআরএম) যথেষ্ট নয়; বরং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন (SHRM/CIPD), ডেটা অ্যানালিটিক্সে দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান (HR Tech), এবং উচ্চ মাত্রার ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের সমন্বয় ঘটাতে হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং কর্পোরেট গভর্নেন্স ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেখানে একজন দক্ষ এইচআর ম্যানেজার প্রতিষ্ঠানের আইনি সুরক্ষা, সাংস্কৃতিক রূপান্তর এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত করে থাকেন। মানুষ ও প্রযুক্তির গতিশীলতা চলমান প্রক্রিয়াকে ধরে রাখতে হলে একজন এইচআর পেশাদারকে অবশ্যই আজীবন শিক্ষার্থী (lifelong learner) থাকতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান যুগে একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নির্ভর করে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং ব্যবসায়িক লক্ষ্যের সঠিক সমন্বয়ের ওপর, যা কেবল একজন দূরদর্শী এইচআর ম্যানেজারের পক্ষেই নিশ্চিত করা সম্ভব।
এমএসএস
মন্তব্য করুন: