insurancejobsbd@gmail.com সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
১৬ চৈত্র ১৪৩২

বাংলাদেশের বীমা খাত: দক্ষ সিইও নিয়োগের সংকট ও কাঠামোগত অন্তরায়


প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫২

ড. বিশ্বজিৎ কুমার মণ্ডল: বাংলাদেশের বীমা খাতে একটি বড় সমস্যা হলো-অনেক ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানির মালিক বা পরিচালনা পর্ষদ (পরিচালনা পর্ষদ) পেশাগতভাবে দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের যোগ্যতা (যেমন এসিআইআই, একচ্যুয়ারি, সিএফএ, সিপিএ ইত্যাদি) সম্পন্ন ব্যক্তিদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিতে আগ্রহী নয়।

এর পেছনে বেশ কয়েকটি গভীর কাঠামোগত, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণ রয়েছে। নিচে বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করা হলো :

মালিকানা-কেন্দ্রিক করপোরেট সংস্কৃতি (Owner-Dominated Governance)

বাংলাদেশের বেশিরভাগ বীমা কোম্পানি পারিবারিকভাবে বা উদ্যোক্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে, বোর্ড চায় কোম্পানির সিদ্ধান্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। একজন স্বাধীন ও পেশাদার সিইও থাকলে তিনি নিয়ম মেনে কাজ করতে বাধ্য থাকবেন। এতে মালিকদের অনিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে যায়। বিনিয়োগ, কমিশন বা বড় আর্থিক সিদ্ধান্তে বোর্ডের হস্তক্ষেপ কমে যাবে। তাই বোর্ড অনেক সময় নিয়ন্ত্রণযোগ্য বা “বিশ্বস্ত” ব্যক্তিকে সিইও হিসেবে বসাতে চায়।

করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বলতা

বাংলাদেশের বীমা খাতে করপোরেট গভর্ন্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের সীমারেখা অস্পষ্ট, কোম্পানি পরিচালনায় পর্ষদের হস্তক্ষেপ, পেশাগত ব্যবস্থাপনা কৃষ্টি নেই। ফলে, পেশাদার সিইও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। বোর্ড অনেক সময় ভারপ্রাপ্ত সিইও বা অনুগত কর্মকর্তা দিয়ে কোম্পানি চালায়। কিছু কোম্পানি বহু বছর স্থায়ী সিইও ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে বা হচ্ছে, যা খাতের সুশাসন দুর্বলতার প্রমাণ। 

আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব (Transparency Risk)

একজন পেশাগতভাবে দক্ষ সিইও সাধারণত: সঠিক আন্ডাররাইটিং নীতিমালা, বিনিয়োগ শৃঙ্খলা, বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্সগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডের কিছু সদস্য চান - সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, অনিয়ন্ত্রিত কমিশন, রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাব ব্যবহার। এই ধরনের কাজ পেশাদার সিইও সহজে অনুমোদন দিতে চান না।

বীমা ব্যবসাকে “সেলস-ড্রিভেন” ভাবা

বাংলাদেশে অনেক কোম্পানি এখনো বীমাকে মনে করে “এটি একটি বিক্রয় (সেল্স) ভিত্তিক ব্যবসা”। ফলে বোর্ড অনেক সময় মনে করে শক্তিশালী মার্কেটিং বা এজেন্সি নেটওয়ার্ক থাকলেই চলবে, বীমার কারিগরি জ্ঞান খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু বাস্তবে বীমা ব্যবসা অত্যন্ত কারিগরি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার শিল্প।

পেশাগত যোগ্য লোকের ঘাটতি

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বীমা পেশাজীবীর সংখ্যা খুবই কম। যেমন: এসিআইআই, ফেলো একচ্যুয়ারি, চার্টার্ড ইন্স্যুরারের সংখ্যা সীমিত। এই কারণে অনেক সময় বোর্ডের কাছে যোগ্য পুল ছোট। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু নিয়ম শিথিলও করেছে যাতে সিইও নিয়োগ সহজ হয়।

বেতন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা

একজন উচ্চমানের আন্তর্জাতিক পেশাজীবী সিইও এর জন্য প্রয়োজন: উচ্চ বেতন, পারফরমেন্স বোনাস, দীর্ঘমেয়াদি ইনসেনটিভ। কিন্তু অনেক বীমা কোম্পানি এই ব্যয় বহন করতে চায় না। ফলে তারা বেছে নেয় তুলনামূলক কম বেতনের কর্মকর্তা, অভ্যন্তরীন বিনয়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী।

বোর্ডের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থ

বাংলাদেশে অনেক বীমা কোম্পানির বোর্ডে থাকেন ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। তাদের অনেক সিদ্ধান্ত বাণিজ্যিক নয়, সম্পর্ক ভিত্তিক। পেশাদার সিইও থাকলে এসব সিদ্ধান্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ভারপ্রাপ্ত সিইও ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ রাখা

অনেক কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে (চলতি দায়িত্ব) সিইও, সিইও (ভারপ্রাপ্ত) দিয়ে কোম্পানি চালায়। কারণ, স্থায়ী সিইও হলে তার ক্ষমতা বেশি হয়, (চলতি দায়িত্ব) সিইও বোর্ডের উপর নির্ভরশীল থাকে। ফলে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।

নিয়ন্ত্রক তদারকির দুর্বলতা (Regulatory Enforcement Gap)

বাংলাদেশের বীমা খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ) থাকলেও এনফোর্সমেন্ট সবসময় শক্তিশালী নয়। অনেক কোম্পানি দীর্ঘদিন সিইও ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। এটি বোর্ডকে সুযোগ দেয় নিয়ম এড়ানোর।

বাস্তব ফলাফল

এই সমস্যার কারণে বাংলাদেশের বীমা খাতে দেখা যায় দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অবলিখন শৃঙ্খলা নেই, দাবি নিষ্পত্তি সমস্যা, গ্রাহকের আস্থা কমে, বাজারের আকার ছোট , বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন খুবই কম (জিডিপি এর প্রায় ০.৪৬%), বীমা খাতে আস্থাহীনতার অভাব, মানুষ বীমা করতে চায় না।

সুপারিশ: (Policy Recommendation)

বাধ্যতামূলক ভাবে পেশাজীবী (প্রোফেসোনাল) সিইও নিয়োগ করা, সিইও হওয়ার জন্য এসিআইআই/ একচ্যুয়ারি/ ইন্স্যুরেন্স ডিপ্লমা বাধ্যতামূলক করা। বোর্ড গভর্নেন্স রিফর্ম করা, পর্ষদের জন্য স্বাধীন পরিচালক বাধ্যতামূলক করা, উপযুক্ত এবং সঠিক পরীক্ষা কঠোর করা, সিইও চাকরি নিশ্চয়তা বাধ্যতামূলক করা, বোর্ড যাতে সহজে অপসারণ করতে না পারে, ইন্স্যুরেন্স প্রোফেশনাল ডেভলপমেন্ট, বাংলাদেশে বীমার উপর উচ্চ শিক্ষা নেয়ার জন্য প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট তৈরি করা, চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট পাথওয়ে বিস্তৃত করা।

এমএসএস

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর