insurancejobsbd@gmail.com বৃহঃস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

আগামী দশকে বীমার ডিজিটাল রূপান্তর ও তরুণদের ক্যারিয়ার ভাবনা!


প্রকাশিত: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪

শিপন ভূঁইয়া: আগামী দশকে বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতিতে বীমা খাতের অবস্থান একটি বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাবে। এতদিন ধরে যে খাতটি কেবল একটি "ঝুঁকি কভার করার দলিল" বা কিছু কাগজপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে তা রূপান্তরিত হয়ে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য ডিজিটাল সেবা ও আর্থিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।

​আগামী দশকে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বীমা খাতের অবস্থান যে ৫টি মূল শক্তিতে প্রতিফলিত হবে তা হলো:

​১. এম্বেডেড ইন্স্যুরেন্স

কোনো পণ্য বা সেবার ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি বীমা সুরক্ষা যুক্ত করার পদ্ধতিকেই এম্বেডেড ইন্স্যুরেন্স বলে। আগামী ১০ বছরে মানুষ আলাদা করে এজেন্টের কাছে বা অফিসে গিয়ে বীমা কিনবে না। বীমা যুক্ত হয়ে যাবে দৈনন্দিন লেনদেনের সাথে। "যেখানে লেনদেন, সেখানেই সুরক্ষা"—বর্তমান এই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। যেসব বিষয়ের সাথে এম্বেডেড ইন্স্যুরেন্স যুক্ত হতে পারে তা হলো:

  • ​ই-কমার্স ও ভ্রমণ: বিমানের টিকিট কাটা, অনলাইন কেনাকাটা বা ই-ক্যাব/রাইড শেয়ারিংয়ের সাথে ছোট ছোট প্রিমিয়ামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বীমা যুক্ত (Embedded) থাকবে।
  • ​মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস: বিকাশ, নগদ বা ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমেই কয়েক ক্লিকে মাইক্রোইন্স্যুরেন্স বা ক্ষুদ্রবীমা গ্রহণ ও দাবি নিষ্পত্তি করা যাবে।

​এটি মূলত দুই বা তিনভাবে গ্রাহকদের অফার করা হয়:

  • ​অপ্ট-ইন: গ্রাহক চাইলে চেকআউট পেজে ম্যানুয়ালি টিক দিয়ে বীমাটি যুক্ত করতে পারেন।
  • ​বিল্ট-ইন বা অপ্ট-আউট: পণ্য বা সেবার মূল দামের সাথেই বীমা যুক্ত থাকে। গ্রাহক না চাইলে সেটি বাদ দিতে পারেন।
  • ​অদৃশ্য বা ফ্রি: গ্রাহকের অজান্তেই সেবার মান বাড়াতে মূল কোম্পানি নিজেই এই বীমার খরচ বহন করে (যেমন- ব্যাংকের প্রিমিয়াম অ্যাকাউন্টধারীদের জন্য ফ্রি লাইফ ইন্স্যুরেন্স)।

​২. এআই, বিগ ডেটা ও তাৎক্ষণিক দাবি নিষ্পত্তি:

বীমার সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ হলো "দাবি নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা"। আগামী দশকে এআই ও অটোমেশন এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি বদলে দেবে, যেমন:

  • ​স্মার্ট ক্লেইম অটোমেশন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে দুর্ঘটনার ছবি বা চিকিৎসার তথ্য আপলোড করার কয়েক মিনিটের মধ্যে জালিয়াতি প্রতিরোধ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাবি পরিশোধ (Instant Settlement) সম্ভব হবে।
  • ​ব্যক্তিভিত্তিক প্রিমিয়াম (Usage-Based Insurance): স্মার্ট ওয়াচ বা আইওটি (IoT) ট্র্যাকার থেকে পাওয়া ডেটার ওপর ভিত্তি করে যার যেমন স্বাস্থ্য বা ড্রাইভিং অভ্যাস, তার জন্য তেমন প্রিমিয়াম নির্ধারণ হবে।

​৩. স্বাস্থ্য ও জলবায়ু ঝুঁকির প্রধান আশ্রয়স্থল:

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন এবং উদীয়মান স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হবে বীমা। উল্লেখযোগ্য হলো:

  • ​প্যারামেট্রিক ও জলবায়ু বীমা: প্রাকৃতিক দুর্যোগের (যেমন- বন্যা বা জলোচ্ছ্বাস) ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘ তদন্ত ছাড়াই স্যাটেলাইট ডেটা দেখে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বা বাসিন্দাদের স্বয়ংক্রিয় ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু হবে।
  • ​সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা: প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সুরক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও মেগাসিটি জীবনের স্বাস্থ্যসংকট সামলাতে স্বাস্থ্য বীমার অবস্থান থাকবে ব্যাংকিং ডিপোজিটের সমপর্যায়ে।

​৪. ব্যাংকিংয়ের মতো আস্থা ও জিডিপিতে অবদান:

বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপিতে বীমার অবদান ০.৩৪%-এর মতো কম হলেও, প্রবিধানের কঠোরতা, ডাবল সার্ভার বন্ধ এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির কারণে আগামী ১০ বছরে এটি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে, যেমন:

  • ​ব্যাংকাস্যুরেন্সের বিপ্লব: ব্যাংক থেকে ডিপোজিট বা ঋণ নেওয়ার মতো বিশ্বস্ত পরিবেশে সাধারণ গ্রাহক বীমা পলিসি কিনতে অভ্যস্ত হবেন।
  • ​নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি এবং ডিজিটাল কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ চালুর ফলে জালিয়াতির সুযোগ কমে আসবে, যা সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

​৫. একটি আকর্ষণীয় 'টেক-ফিন্যান্স' ক্যারিয়ার হাব:

আগামী দশকে এটি প্রথাগত এজেন্টের বাজার থেকে বেরিয়ে গিয়ে InsurTech, Data Analytics, Actuarial Science এবং Risk Architecture-এর তরুণ পেশাদারদের প্রথম সারির পছন্দ হয়ে উঠবে।

​সংক্ষেপে বললে, আগামী দশকে বীমা কেবল একটি আর্থিক পণ্য থাকবে না! এটি হবে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর এমন এক অদৃশ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যা মানুষের স্বাস্থ্য, সম্পত্তি, শিক্ষা ও অবসর জীবনকে প্রতিদিন ব্যাকগ্রাউন্ডে থেকে সুরক্ষিত রাখবে। বাংলাদেশের বীমা সেক্টরে দক্ষ, শিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তরুণদের বীমায় ক্যারিয়ার গড়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

লেখক: কলামিস্ট, ইন্স্যুরেন্স সেক্টর।

 

এমএসএস

সম্পর্কিত খবর