প্রকাশিত:
৩১ আগষ্ট ২০২৬, ২১:৩৪
মো. তোফাজ্জেল হোসাইন (মানিক): সাম্প্রতিক সময়ে এমএলএম (MLM) এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর প্রজ্ঞাপন আমাদের একটি রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। বিনিয়োগের নামে চারদিকে এখন চটকদার প্রলোভনের ছড়াছড়ি। দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এমন সব ফাঁদে পা দিচ্ছেন, যার শেষ পরিণতি হচ্ছে সর্বস্বান্ত হওয়া।
একটি স্থিতিশীল সমাজ এবং নিরাপদ অর্থনীতির জন্য সঠিক বিনিয়োগ খাত নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি, আর এখানেই বীমা বা ইন্স্যুরেন্সের অপরিসীম গুরুত্বটি ফুটে ওঠে।
বিনিয়োগের বাজারকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
রিয়েল মার্কেট: ব্যাংক, শেয়ার বাজার এবং বীমা খাত হলো প্রকৃত ও বৈধ বিনিয়োগের জায়গা, যা সরকারি নিয়ম-নীতি দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
ফেইক মার্কেট: ক্রিপ্টোকারেন্সি, ফরেক্স ট্রেডিংয়ের নামে ভুয়া প্ল্যাটফর্ম এবং এমএলএম পদ্ধতিতে বা ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে জমি, রিসোর্টের শেয়ার বিক্রি। এগুলো বাস্তবে বিনিয়োগকারীর জন্য কোনো আইনি বা বাস্তব সম্পদ তৈরি করে না, বরং চটকদার প্রচারণার মাধ্যমে কেবল মানুষের টাকা হাতিয়ে নেয়।
"অতিরিক্ত লাভের আশায় মানুষ তার জীবনের সব সঞ্চয় এমন জায়গায় বিনিয়োগ করে, যার কোনো আইনি বৈধতা নেই।"
আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব কাজ করে। যখন কাউকে বীমায় ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য বছরে ১০ বা ২০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার কথা বলা হয়, তখন অনেকেই অনীহা প্রকাশ করেন এবং নানা অজুহাত দেখান। অথচ সেই একই ব্যক্তি যখন শোনেন কোনো এমএলএম কোম্পানিতে টাকা রাখলে মাসে মাসে বড় অঙ্কের লভ্যাংশ পাওয়া যাবে, তখন তিনি চোখ বন্ধ করে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। অনেক সময় সুকৌশলে ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করেও এই ফাঁদ পাতা হয়। ফলাফল? কয়েক মাস পর কোম্পানির অস্তিত্ব থাকে না, আর বিনিয়োগকারী হন নিঃস্ব।
অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের বিপরীতে বীমায় বিনিয়োগ করার সুবিধাগুলো বহুমুখী:
নিশ্চিত নিরাপত্তা: বীমা কোনো রাতারাতি ধনী হওয়ার স্কিম নয়। এটি একটি সুশৃঙ্খল আর্থিক পরিকল্পনা, যা আপনার অনুপস্থিতিতেও আপনার পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা: বীমা খাত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (যেমন- আইডিআরএ) দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত। এখানে এমএলএম বা ক্রিপ্টোর মতো টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই।
দ্বৈত সুবিধা: বীমায় আপনি কেবল সঞ্চয়ই করছেন না, বরং জীবন ও সম্পদের বিশাল সুরক্ষাও পাচ্ছেন। অন্য কোনো বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এই ডাবল বেনিফিট দিতে পারে না।
সামাজিক নিরাপত্তা: একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে যদি বীমার আওতায় আনা যায়, তবে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো জাতির অর্থনৈতিক ভিত মজবুত হয়।
সাধারণ মানুষকে এই রিয়েল এবং ফেইক বিনিয়োগের পার্থক্য বোঝানো এবং বীমার প্রকৃত গুরুত্ব তুলে ধরা এই খাতের পেশাজীবীদের জন্য এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্যে বীমা পেশাজীবীদের নিচের বিষয়গুলোতে ফোকাস করা জরুরি:
পেশাগত দক্ষতা ও জ্ঞান বৃদ্ধি: গ্রাহকের যেকোনো প্রশ্নের আত্মবিশ্বাসী উত্তর দিতে পেশাজীবীদের নিয়মিত নিজেদের দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে। সমসাময়িক আর্থিক বাজার ও ফেইক বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।
বিক্রেতা নয়, পরামর্শক হোন: গ্রাহককে শুধু পলিসি বিক্রির চেষ্টা না করে, তাকে সঠিক আর্থিক সাক্ষরতা দিন। লজিক ও ডেটা ব্যবহার করে রিয়েল ও ফেইক মার্কেটের পার্থক্য বুঝিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করুন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কার্যকর ব্যবহার: গ্রাহকদের সচেতন করতে ছোট ছোট তথ্যবহুল কনটেন্ট (যেমন- মাইক্রো-লার্নিং বা ইনফোগ্রাফিক) সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার করুন, যাতে তারা সহজেই বিষয়গুলো বুঝতে পারেন।
স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা বজায় রাখা: কোনো অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বীমার মূল শক্তি যে 'সুরক্ষা' এবং 'দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয়'-সেটিই সহজভাবে গ্রাহকের সামনে উপস্থাপন করুন।
আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রতারক চক্র সবসময়ই নতুন নতুন রূপ নিয়ে বাজারে আসবে। কখনো এমএলএম, কখনো জমি, আবার কখনো ডিজিটাল কারেন্সির নাম করে। কিন্তু দিনশেষে, নিজের এবং পরিবারের একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য বীমার কোনো বিকল্প নেই। পেশাজীবীদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও দক্ষতাই পারে সাধারণ মানুষকে এই নিরাপদ বিনিয়োগের পথে নিয়ে আসতে।
লেখক: হেড অব ট্রেনিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।
এমএসএস