insurancejobsbd@gmail.com সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
২ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রশিক্ষণ বনাম দক্ষতা: বীমা পেশায় সফলতার আসল রহস্য কোথায়?


প্রকাশিত: ১৭ আগষ্ট ২০২৬, ০৯:১৪

তোফাজ্জেল হোসাইন (মানিক): বীমা খাতে কর্মরত পেশাজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মশালা পরিচালিত হচ্ছে। সংস্থাগুলো বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় করছে জনবলকে প্রশিক্ষিত করতে। অথচ প্রশিক্ষণ নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই অনেকের পক্ষ থেকে একটি সাধারণ হতাশা শোনা যায়- “এত ট্রেনিং করলাম, তবুও আশানুরূপ সাফল্য পাচ্ছি না কেন?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে ‘প্রশিক্ষণ’ (Training) এবং ‘দক্ষতা’ (Skill)-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য এবং কর্মক্ষেত্রে এদের পারস্পরিক ভূমিকা।

ড্রাইভিং শেখার সহজ সমীকরণ

বিষয়টি একটি সহজ বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক।

ধরুন, একজন ব্যক্তি গাড়ি চালানো শিখতে চান। একজন দক্ষ ট্রেইনার তাকে গাড়ির গঠন, স্টিয়ারিং হুইল, এক্সিলারেটর, ব্রেক, গিয়ার এবং ট্রাফিকের নিয়মাবলি সম্পর্কে দেড় ঘণ্টা ধরে বিস্তারিত ধারণা দিলেন। প্রশিক্ষণার্থী তাত্ত্বিকভাবে সবকিছুই নির্ভুলভাবে বুঝে নিলেন। কিন্তু ক্লাস শেষেই যদি তাকে গাড়ির চাবি দিয়ে রাস্তায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তিনি কি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন?

উত্তর- না, পারবেন না।

কারণ, প্রশিক্ষণ তাকে কেবল একটি রূপরেখা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যে বিষয়টি প্রয়োজন, তা হলো ‘দক্ষতা’ বা প্র্যাকটিক্যাল স্কিল- যা তৈরি হয় নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে।

প্রশিক্ষণ ধারণা দেয়, কিন্তু দক্ষতা পৌঁছায় গন্তব্যে

প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন:

প্রশিক্ষণ একটি নির্দিষ্ট সেশন: এটি স্বল্পমেয়াদি হতে পারে (১ ঘণ্টা, ২ ঘণ্টা বা কয়েক দিন), যা নির্দিষ্ট বিষয়ের কাঠামোগত ধারণা দেয়।

দক্ষতা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া: এটি বাস্তব ক্ষেত্রে বারবার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়।

বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির কথাই ধরা যাক। তার নিখুঁত গোল বা নজরকাড়া ফ্রি-কিক কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষার ফল নয়; বরং দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের নিরবচ্ছিন্ন সাধনার ফসল। বার্সেলোনার শুরুর দিনগুলোতে তিনি নিয়মিত ফ্রি-কিক নিতেন না। যখন সেই দায়িত্ব তাঁর কাঁধে আসে, তখন তিনি মাঠে ডামি সাজিয়ে দিনে ৫০০ থেকে ১,৫০০ বার শট নেওয়ার কঠোর অনুশীলন করেছেন। এই ধারাবাহিক অনুশীলনই তাঁর জ্ঞানকে অনন্য এক দক্ষতায় রূপান্তরিত করেছে।

আমাদের ব্যর্থতার মূল কারণ

বীমা খাতে বহু কর্মীর প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়ার প্রধান দুটি কারণ:

মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের অভাব: প্রশিক্ষণে যা শেখা হয়, মাঠপর্যায়ে বাস্তব কাজের সঙ্গে তার সমন্বয় না করা।

ধৈর্যের ঘাটতি ও হাল ছেড়ে দেওয়া: মাঠে নামার পর প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ বা ব্যর্থতার মুখে অনেকেই অনুশীলন বন্ধ করে দেন। অথচ প্রতিটি ব্যর্থতাই নতুন কিছু শেখার এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ।

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিন সকালের ব্রিফিং, মাঠপর্যায়ের কাজ, ভুল পর্যালোচনা এবং সিনিয়রদের পরামর্শ নেওয়ার একটি নিয়মিত সংস্কৃতি থাকে। এর মাধ্যমেই তারা প্রশিক্ষণকে দিনে দিনে উচ্চতর দক্ষতায় পরিণত করে।

সফলতার কার্যকর রূপরেখা

বীমা পেশায় প্রশিক্ষণের শতভাগ সুফল ঘরে তুলতে হলে নিচের ৩টি পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই:

ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ: বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পরিধি প্রতিনিয়ত আপডেট রাখা।

নিয়মিত মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ: অর্জিত জ্ঞান বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত চর্চা করা।

ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ: কাজের ক্ষেত্রে যেখানে বাধা আসবে, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সেই ভুলগুলো সংশোধন করা এবং একই ভুল পুনরাবৃত্তি না করা।

সর্বোপরি, প্রশিক্ষণ আমাদের পথ দেখায়, কিন্তু সেই পথে হেঁটে গন্তব্যে নিয়ে যায় কেবল আমাদের দক্ষতা (Skill)। প্রশিক্ষণকে যদি মাঠের বাস্তবতায় প্রয়োগ না করা হয়, তবে তা কেবল কিছু খাতা-কলমের নোট আর সুন্দর কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

বীমা খাতে প্রকৃত সফলতা ও টেকসই ক্যারিয়ার নিশ্চিত করতে হলে প্রশিক্ষণের প্রতিটি তত্ত্বকে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে দক্ষতায় রূপান্তর করাই পেশাদারদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এমএসএস

সম্পর্কিত খবর