প্রকাশিত:
২ আগষ্ট ২০২৬, ২২:৩৩
মো. তোফাজ্জেল হোসাইন (মানিক): বীমা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো একটি দক্ষ, স্মার্ট ও পেশাদার সেলসফোর্স। একজন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট (এফএ)’কে কেবল 'পলিসি বিক্রির হাতিয়ার' হিসেবে বিবেচনা করার দিন শেষ।
প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন এবং ইন্ডাস্ট্রির ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করতে হলে এই এফএ’দের ভবিষ্যতের লিডার বা পূর্ণাঙ্গ 'ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট' হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
সাধারণ একজন কর্মীকে ভবিষ্যৎ লিডার হিসেবে গড়ে তুলতে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি, তা নিয়ে আমার আজকের আলোচনা:
ধারাবাহিক ও স্কিল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ
নতুন কর্মীদের কেবল প্রাথমিক 'প্রডাক্ট নলেজ' দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিলে তারা লিডার হতে পারবেন না। তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদি লার্নিং প্রসেসের মধ্যে রাখতে হবে। ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং, ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট, অবজেকশন হ্যান্ডেলিং এবং আধুনিক সেলস সাইকোলজির ওপর ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে গতানুগতিক ক্লাসরুম ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি 'মাইক্রো-লার্নিং' এবং 'ইন্টারঅ্যাকটিভ মডিউল' ব্যবহার করা যেতে পারে, যেন তারা কাজের ফাঁকেই নিজেদের স্কিল আপগ্রেড করতে পারেন।
উদ্যোক্তা মানসিকতা তৈরি
বীমা পেশাটি মূলত একটি স্বাধীন ব্যবসা। কর্মীদের মাঝে শুরু থেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার স্পৃহা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তারা যেন নিজেদের কেবল একজন সেলসম্যান না ভেবে, একটি স্বাধীন আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সিইও হিসেবে কল্পনা করতে পারেন -সেই আত্মবিশ্বাসটি তাদের মাঝে বুনে দেওয়া ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব।
বস নয়, প্রয়োজন প্রকৃত মেন্টরিং
ভবিষ্যৎ লিডার তৈরির কারিগর হলেন বর্তমান লিডাররা। ব্রাঞ্চ বা ইউনিট ম্যানেজারদের শুধু টার্গেট দিলে চলবে না, বরং তাদের প্রকৃত 'মেন্টর' বা কোচ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। ফিল্ডে গিয়ে হাতে-কলমে কাজ শেখানো, ব্যর্থতার সময়গুলোতে পাশে থেকে সাহস জোগানো এবং কর্মীদের ছোট ছোট অর্জনগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের মাঝে লিডারশিপের গুণাবলি তৈরি করা সম্ভব।
পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতায়ন
আধুনিক যুগে লিডারশিপের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে 'ডিজিটাল প্রেজেন্স'। কর্মীদের শেখাতে হবে কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা নিজেদের একটি প্রফেশনাল 'ব্র্যান্ড' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। প্রফেশনাল গ্রাফিক্স, প্রেজেন্টেশন এবং কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) টুলস ব্যবহারে তাদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। প্রযুক্তিগত ক্ষমতায়ন তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার রোডম্যাপ
একজন এফএ যদি দেখেন যে তার ক্যারিয়ারের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তবে তিনি লিডার হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন না। তাই নিয়োগের শুরুতেই তার সামনে একটি সুস্পষ্ট 'ক্যারিয়ার রোডম্যাপ' তুলে ধরতে হবে। পারফর্ম্যান্সের ভিত্তিতে এফএ থেকে কীভাবে ইউনিট ম্যানেজার, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়া যায়- তার একটি স্বচ্ছ ও অর্জনযোগ্য রূপরেখা থাকা বাধ্যতামূলক।
সর্বপোরি, ভবিষ্যৎ লিডার তৈরির এই প্রক্রিয়া রাতারাতি সম্পন্ন হওয়ার নয়। এটি একটি কাঠামোগত এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ। আমরা যদি কর্মীদের সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সাপোর্ট এবং উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা দিয়ে ক্ষমতায়ন করতে পারি, তবে এই এফএ-রাই আগামী দিনে বীমা শিল্পের নেতৃত্ব দেবেন। প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছাই পারে একজন সাধারণ কর্মীকে একজন আইকনিক লিডারে রূপান্তরিত করতে।
লেখক: হেড অব ট্রেনিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।
এমএসএস