প্রকাশিত:
২৫ জুলাই ২০২৬, ২২:৪৮
রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশে কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমার পরিধি বাড়ছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর আওতায় রয়েছে শুধু শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো অধিকাংশ স্বাস্থ্যবীমার বাইরে। ফলে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় কাউন্সেলিং বা মনোরোগ চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত কি না, সেই প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই আলোচনার পেছনে রয়েছে উদ্বেগজনক কিছু পরিসংখ্যান। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮–১৯) অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৮.৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। অথচ তাদের প্রায় ৯১ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান না। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা ও সেবাপ্রাপ্তির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতার প্রভাব কর্মক্ষেত্রেও স্পষ্ট। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে কাজের ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ অনেক কর্মীর মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে সামাজিক সংকোচ, সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অনেকেই পেশাদার সহায়তা নিতে পারেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, কর্মক্ষম বয়সী প্রতি সাতজন মানুষের একজন কোনো না কোনো মানসিক সমস্যার সঙ্গে বসবাস করেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের কারণে বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
মানসিক সমস্যার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মী কর্মস্থলে উপস্থিত থাকলেও মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কর্মদক্ষতা কমায়, অনুপস্থিতি বাড়ায় এবং দক্ষ কর্মী ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো মানুষকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩ শতাংশ সরাসরি রোগী বা তার পরিবার পরিশোধ করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং বা মনোরোগ চিকিৎসার ব্যয় অনেক কর্মীর নাগালের বাইরে থেকে যায়। প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেকে চিকিৎসা শুরু করতে পারেন না বা মাঝপথে বন্ধ করে দেন।
এই প্রেক্ষাপটে কর্মীদের স্বাস্থ্যবীমায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কাউন্সেলিং, সাইকোথেরাপি, মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বীমার আওতায় এলে কর্মীরা তুলনামূলক দ্রুত চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত হবেন। এতে সমস্যা জটিল হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে শুধু বীমা সুবিধা সম্প্রসারণই যথেষ্ট নয়। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং কর্মস্থলে বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অযৌক্তিক কাজের চাপ, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও কর্মস্থলে হয়রানির মতো ঝুঁকি কমানোর দিকেও নজর দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে করপোরেট খাতে স্বাস্থ্যবীমার পরিধি ধীরে ধীরে বাড়ছে। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্যসুরক্ষার অংশ করা হবে কি না, সেটিও এখন নিয়োগকর্তা, বীমা খাত এবং নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
এমএসএস