insurancejobsbd@gmail.com মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
১০ ভাদ্র ১৪৩৩

বীমা পেশায় এফএ'দের ঝরে পড়া: পেছনের মূল কারণ ও বাস্তবতা


প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০২৬, ০২:২৯

মো. তোফাজ্জেল হোসাইন (মানিক): বীমা শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হলেন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট (এফএ) বা মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। কোম্পানির প্রবৃদ্ধি এবং বীমা সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমান বীমা শিল্পের অন্যতম বড় এবং নীরব সংকট হলো এই এফএ'দের অস্বাভাবিক হারে ঝরে পড়া বা 'ড্রপ আউট'।

নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের একটি বড় অংশ প্রথম এক বছরের মধ্যেই পেশা পরিবর্তন করছেন।

কেন এই সম্ভাবনাময় পেশা থেকে কর্মীরা এত দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন? এর পেছনের মূল কারণ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আমরা একটু বিশ্লেষণ করতে চাই:

 

১. প্রশিক্ষণ ছাড়া বীমা বিক্রি: দক্ষতার বদলে ‘আবেগ’ বিক্রি

বীমা পেশায় এফএ'দের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ হলো কোনো ধরনের পেশাদার প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া। প্রশিক্ষণ ছাড়া বীমা বিক্রি করাকে কোনোভাবেই প্রফেশনাল সেলস বলা যায় না, এটি মূলত ‘আবেগ বিক্রি’। দক্ষতা অর্জন না করে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে বা গ্রাহককে প্রলুব্ধ করে বীমা বিক্রি করলে তা কখনোই টেকসই হয় না। বীমা বিক্রি করতে হলে একজন কর্মীকে অবশ্যই যথাযথ বীমা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে নতুন কর্মীরা মাঠে গিয়ে বারবার প্রত্যাখ্যাত হন এবং দ্রুত হতাশ হয়ে ঝরে পড়েন।

 

২. অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা এবং মানসিক চাপ

নিয়োগের পরপরই কর্মীদের ওপর অনেক সময় অবাস্তব সেলস টার্গেট বা লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হয়। পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকার এই লড়াইয়ে নতুন কর্মীরা খাপ খাওয়াতে পারেন না। টার্গেট পূরণের এই ক্রমাগত মানসিক চাপ তাদের পেশার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।

 

৩. অনিশ্চিত আয় ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা

বীমা পেশায় আয় মূলত কমিশন-ভিত্তিক। একজন নতুন কর্মীর জন্য প্রথম কয়েক মাসে একটি শক্ত ক্লায়েন্ট বেস তৈরি করা বেশ কঠিন। এই সময়ে কোনো নির্দিষ্ট ফিক্সড স্যালারি বা প্রাথমিক আর্থিক সাপোর্ট (Stipend/Allowance) না থাকায়, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নির্বাহ করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বাধ্য হয়েই তারা অন্য পেশার দিকে ঝুঁকেন।

 

৪. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত স্বীকৃতির অভাব

আমাদের সমাজে এখনও বীমা পেশাকে একটি প্রথম সারির সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি তৈরি হয়নি। সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্র্যান্ডিং এবং পেশাগত স্বীকৃতি না থাকার কারণে তরুণ ও মেধাবীরা এই পেশায় দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ার গড়তে উৎসাহ পান না।

 

৫. ভুল নিয়োগ প্রক্রিয়া 

"যে কেউ বীমা কর্মী হতে পারে" -এই ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক সময় প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই না করেই ঢালাওভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সঠিক লোক নিয়োগ না করার কারণেই পরবর্তীতে তারা এই পেশার চাপ এবং চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন না।

 

মাঠপর্যায়ের ভয়াবহ বাস্তবতা: পলিসি তামাদী ও কোম্পানির ধ্বংস

প্রশিক্ষণ ছাড়া আবেগ দিয়ে বীমা বিক্রির সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে ২০২২ সালের একটি পরিসংখ্যানে। ওই পরিসংখ্যানের তথ্য অনুসারে, ১৭ লাখ ৭১ হাজার পলিসির মধ্যে ১১ লাখ ৫০ হাজার পলিসিই তামাদী (Lapse) হয়ে গেছে!

এই বিপুল সংখ্যক পলিসি তামাদী হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো- এফএ'রা দক্ষতা অর্জন না করে শুধু আবেগ দিয়ে এবং গ্রাহককে অবাস্তব প্রলোভন দেখিয়ে বীমা বিক্রি করেছেন। 

একজন এফএ যখন পেশা ছেড়ে দেন, তখন তার তৈরি করা গ্রাহকরা 'অরফান পলিসিহোল্ডার'-এ পরিণত হন এবং সঠিক সার্ভিসিংয়ের অভাবে পলিসিগুলো তামাদী হয়ে যায়। 

মনে রাখতে হবে, এই তামাদী পলিসিগুলোই দিনশেষে বীমা কোম্পানিগুলো ধ্বংসের মূল কারণ। এটি শুধু কোম্পানির বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিই করে না, বরং পুরো বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের চরম আস্থাহীনতা তৈরি করে।

 

উত্তরণের পথ

এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে বীমা কোম্পানিগুলোকে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ছাড়া বীমা বিক্রিতে পুরোপুরি বাধা প্রদান করতে হবে। কর্মীদের জন্য আধুনিক, ইন্টারঅ্যাকটিভ এবং স্কিল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ (Micro-learning/Skill modules) নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রথম ৬ মাস বা ১ বছরের জন্য একটি বেসিক আর্থিক নিরাপত্তার কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, এফএ'দের শুধুমাত্র 'সেলসম্যান' না ভেবে 'ফাইন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং তাদের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই ঝরে পড়ার হার কমিয়ে বীমা শিল্পে একটি টেকসই ও পেশাদার জনবল গড়ে তোলা সম্ভব।

আগামী পর্বে আমরা আলোচনা করব: "এফএ’দের ব্যর্থতার নেপথ্যে: কোথায় আমাদের ঘাটতি?"। ইন্স্যুরেন্স জবস বিডির সাথেই থাকুন।

লেখক: হেড অব ট্রেনিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।

এমএসএস

সম্পর্কিত খবর